Friday, May 27, 2016

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ নীলিমা ইব্রাহিমের "বহ্নি বলয়"।

যুগ পাল্টায়। পাল্টায় রীতিনীতি, চিন্তা চেতনা। কিন্তু সমাজের একটা শ্রেণী সংস্কার আঁকড়ে ধরে থাকে জাপটে, কষে। আর তাই একটা বলয়ে তালগোল হারিয়ে ফেলে প্রতিটা প্রজন্ম।

বহ্নি বলয় লেখিকার আত্মজৈবনিক উপন্যাস বলেই মনে হয়েছে। নাও হতে পারে। আমার মনে হয়েছে এটা শুধুই উপন্যাস না। আবার উল্লেখ ও নেই যে এটা আত্মজৈবনিক উপন্যাস। লেখিকা একটি নারী উন্নয়ন বিষয়ক আনুষ্ঠানিক কর্মসূচীতে হাওয়াই দ্বীপে গিয়ে হঠাৎ খুজে পান তার কৈশোরের সাথী বালি কে। বালি ছিল একজন নিম্নবর্গের কোল কিশোরী। লেখিকার চাচার বাংলোতে কাজ করতো বালির মা। আর লেখিকা বাংলোতে বেড়াতে এলে বালি ছিল তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী।

কয়েক যুগ বালিকে দারুন বদলে দিয়েছে। আদিবাসী সেই উচ্ছল কিশোরী এখন একদম মার্কিন নারী, মুখে মার্কিন অ্যাকসেন্ট। কিন্তু তার জীবন? সে যেন হাওয়াই দ্বীপের বালুয়ারিতে আছড়ে পড়া উথাল পাথাল ঢেউ। কখনো ভাসিয়ে এনেছে, কখনো টেনে নিয়ে গেছে সব। জানতে চান তার সম্পরকে? তাহলে পড়ে ফেলুন "বহ্নি বলয়"।


ক্ষীণতনু উপন্যাসটা আঁচর কেটে রাখবে নিশ্চিত। অল্পকটা পাতায় লেখিকা জীবনের কথা, জীবন সংগ্রামের কথা, সংস্কারের কথা, সংস্কারের বলয়ে পৃষ্ঠ মানুষের কথা দারুন ভাবে তুলে ধরেছেন। কেউ হয়ত সংস্কার ভাঙ্গার সাহস করে, তবে বেশিরভাগই জীবনের পালে মুক্ত হাওয়া লাগাতে পারেনা।এটি সংস্কার ভাঙ্গা ও না ভাঙ্গতে পাড়া মানুষের গল্প।


বইঃ বহ্নি বলয়
লেখকঃ নীলিমা ইব্রাহিম
প্রকাশনীঃ মুক্তধারা
পৃষ্ঠাঃ ৬৯ 
প্রথম প্রকাশঃ ১৯৮৫

Sunday, May 22, 2016

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ তানভীর তারেকের "লীলামহল"।

লেখক একজন সাংবাদিক, তাই সমাজের নোংরামি তার কাছে অনেকটাই স্পষ্ট। আর তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তার লীলামহল উপন্যাসে। থ্রিলার ধর্মী উপন্যাসটি একাবারে খারাপ ও লাগেনি, আবার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার মতো ভালো ও লাগেনি। অ্যাভারেজ বলাটাই ঠিক হবে।

উপন্যাসটি বয়ে চলেছে ইমন কে সাথে নিয়ে। তার প্রেমিকা বিভার বাবা কিবরিয়া সাহেব একজন সংসদ সদস্য। তিনি চান না ইমন এর সাথে বিভার কোন সম্পর্ক থাকুক। আর একারনে ইমন যেখানেই চাকরীতে ঢোকে, কমাসের মধ্যেই চাকরি চলে যায়। নানা জায়গায় পোড় খেয়ে ইমন লীলা মজুমদারের টোপ গেলে। যুক্ত হয়ে যায় লীলামহলে। এদিকে বিভা তার তিন বান্ধবীকে নিয়ে একটা সিক্রেট গ্যাং চালায় সমাজের নোংরামি ধুর করার লক্ষ্যে, যদিও কিছুটা নোংরামি তাদের ও করতে হয়।

লীলা মহলে জড়িয়ে পড়ে ইমন ধীরে ধীরে বুঝতে পারে যে সে এক চোরাবালিতে পা দিয়ে ফেলেছে। ফেসে যাচ্ছে, কিন্তু বের হবার উপায় নেই। (আর কিছু বলবো না, তাহলে পড়ার সময় আমারে গাইল দিবেন)

এভাবেই বয়ে চলে কাহিনী। সমাজের উচু শ্রেণীর নোংরামি, রাজনৈতিক নোংরামি এসব বেশ নগ্ন ভাবে ফুটে উঠেছে উপন্যাসে। পড়ে দেখতে পারেন।

বইঃ লীলামহল
লেখকঃ তানভীর তারেক
প্রকাশনীঃ জাগৃতি
প্রকাশকালঃ ২০১৪
পৃষ্ঠাঃ ৯৬
মুল্যঃ ১৭৫/- (মুদ্রিত) 

Friday, May 20, 2016

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের "পাশ বালিশ"।

"পাশ বালিশ" সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের একটি রম্য রচনা সংকলন। নিচের রম্য রচনাগুলো এই সংকলনে স্থান পেয়েছে-

. হালুইকর ও যোগাড়ে
. বরবাদ
. মনুষয হও
. ইয়ে
. ফলগু
. নির্জনতায় আমরা ভয় পাই
. কাজের সময় কাজি, কাজ ফুরোলেই পাজি
. উতল দখিণ বাতাসে
. যে ট্রেন থামে না যার কোন ইষটিশন নেই
. তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
. হাসতে মানা নেই
. কী হল দাদা
. প্রশ্নউত্তরে দুর্গৎসব
. ফাবেডিরু
. পাশ বালিশ



বইটাকে দুর্দান্ত বলবো না, তবে ভালো। কয়েকটা রচনাকে অবশ্য দুর্দান্ত না বললে কম হয়ে যায়। দারুণ হিউমারে পরিপূর্ণ। আবার কয়েকটা বেশ সাধারন। দুটো জায়গা আমি কোট করতে চাই-

"স্ত্রী হল চীনেমাটির বাহারি ফুলদানি। সেই ফুলদানিতে জীবনের যতো দুঃখ সুখের ফুল সাবধানে সাজিয়ে রাখতে হয়। অফিসের বড়কর্তার সাথে ইয়ার্কি চলে। ইয়ার্কি চলে পুলিশ সার্জেন্টের সাথে। এমনকি চিড়িয়াখানায় বাঘের খাচার সামনে দাড়িয়ে চুমখুরি মারা যায়; একমাত্র ইয়ার্কি চলে না স্ত্রীর সাথে। সবসময় মন জুগিয়ে চলতে হয়। খুশ মেজাজে রাখতে হয়। দেয়াশলাই কাঠি আর খোলের সম্পর্ক বেশি ঘষলেই ফ্যাস" (হে নারী সমাজ, আমি অট্টহাসি দিয়েছি বলিয়া আমায় ক্ষমা করো)

"সব জীবেরই একটা সমাজ আছে। বাঘের আছে। সিংহের আছে। পাখির আছে। কুকুরের আছে। সাধারন কিছু নিয়ম তারা মেনে চলে। ঝাকের পাখি, ঝাকের মাছ কদাচিৎ নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করে। ক্যানিবলিজম নেই বললেই চলে। বাঘে বাঘ মারে না। গোয়ালে দুটো গরু পাশাপাশি বেঁধে রাখলে রাতে একটা আরেকটা কে খেয়ে ফেলে না বা গুঁতিয়ে মেরে ফেলে না। গোয়ালের দরজা খুলে মুংলী গাই প্রতিবেশির গোয়ালে ঢুকে ঝুমরী গাইকে বলেনা, চল মধুকে বাশ দিয়ে আসি।

মানুষ খুব বুদ্ধিমান প্রাণী। ভাবতে জানে, ভাবাতে জানে। সাড়া পৃথিবী তার পায়ের তলায়। আকাশের দুরপ্রান্ত তার দখলে। সুচারু চেহারা। বড় বড় দাঁত নেই। নখওয়ালা সাঙ্ঘাতিক থাবা নেই। মানুষের গ্রন্থাগারে জ্ঞান ঠাঁসা বই। মগজে জ্ঞান বিজ্ঞানের বীজ। মুখে বড় বড় কথা। প্রেম ভালোবাসা, আত্মউৎসর্গ, হীতসাধন। তবু মানুষের মতো অনিশ্চিত প্রাণী জীবজগতে আর দুটি নেই"।


বইঃ পাশ বালিশ
লেখকঃ সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
জনরাঃ রম্য রচনা
প্রকাশনীঃ পুস্প
পৃষ্ঠাঃ ৯৬

 

Wednesday, May 18, 2016

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ কাজী গোলাম গউস সিদ্দিকীর "ত্রিপুরা উপজাতির উপকথা"।

ত্রিপুরা উপকথাগুলো সংগ্রহ করেছেন কাজী গোলাম গউস সিদ্দিকী। চাকরি সুত্রে ত্রিপুরা রাজ্যে দুবছর থেকে তিনি ত্রিপুরা উপজাতির রীতিনীতি ভালবেসে ফেলছেন। তারই প্রকাশ এই  "ত্রিপুরা উপজাতির উপকথা" শীর্ষক উপকথা সংকলনটি। ৭ টি ছোট ছোট উপকথা নিয়ে ছোট একটি সংকলন। উপকথাগুলোর সুচী নিম্নরূপ-

১. দুই বোন ও নোয়াই পাখি
২. বানর বউ
৩. গন্ধবিহীন স্বর্গীয় ফুল অর্কিড
৪. সাদা হাতি ও বাদুরের গল্প
৫. বৃদ্ধা ও গোসাপ
৬. ত্রিপুরার লোককথা
৭. রক্তচোষা দেবতা


এর মধ্যে বানর বউ, গন্ধবিহীন স্বর্গীয় ফুল অর্কিড, সাদা হাতি ও বাদুরের গল্প এই তিনটা অসাধারন। বাকিগুলা ও বেশ ভালো। উপকথা মাত্রই শিশুতোষ হবে এটা মেনে নিয়ে পড়ে ফেলুন, দারুণ লাগবে। 

 
বইঃ ত্রিপুরা উপজাতির উপকথা
সংকলক ও সম্পাদকঃ কাজী গোলাম গউস সিদ্দিকী
প্রকাশনীঃ মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স 
প্রকাশকালঃ মাঘ, ১৪১০
পৃষ্ঠাঃ ৫০
মুল্যঃ ৩৫ রুপী (মুদ্রিত) 




বি.দ্রঃ যারা পিডিএফ পড়তে আগ্রহী তারা এখান থেকে ডাউনলোড করে নিতে পারেন। 

Tuesday, May 17, 2016

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ কিঙ্কর আহসানের "আঙ্গারধানি"।

 উপন্যাসের কাহিনী শুরু হয় কেন্দ্রীয় চরিত্রের ছোট বোন পুতুলের মৃত্যু দিয়ে। কিন্তু সে মৃত্যু খুব একটা গুরুত্ত পায়নি উপন্যাস জুড়ে। বরং পরিবারে একটা খুশির আবেশ সৃষ্টি হয় বহুদিন পরে পুতুলের মৃত্যু উপলক্ষে বড় ভাইয়ের ফিরে আসায়।

বড় ভাই আসায় আনন্দের সাথে চাপা উদ্বেগ ও কাজ করতে থাকে। কারন খালাতো বোন নিশার সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল, কিন্তু তাকে ফেলে হঠাৎ একদিন পালিয়ে যায় বড় ভাই। পেটে বাচ্চা আসে নিশার। নিশার বাচ্চাটা কে যেন মেরে ফেলে। পরে বিয়ে হয় নিশার। কিন্তু এখন বড় ভাই আসায় সে প্রেম যদি আবার জেগে ওঠে। এদিকে নায়ক ও ভালোবাসে নিশাকে। কিন্তু পাত্তা পায়না।


এরপর উপন্যাস জুড়ে একটাই প্রশ্ন ঘুরতে থাকে, কেন পালিয়ে গিয়েছিল বড়ভাই। কারন গ্রামের সবাই জানতো নিশার সাথে বড় ভাইয়ের বিয়ে হবে। তাহলে কি অন্য কিছু আছে? নিশার বাচ্চার বাবা কি অন্য কেউ। আস্তে আস্তে জট খুলতে থাকে। উঠে আসে ভয়ানক নির্মম সত্য।

কি সেই সত্য জানতে হলে আমার মতো আপনাকেও বইটা পড়তে হবে। বইটা সম্পর্কে আমার মতামত হল, খুব একটা ভালো লাগেনি। নাম করন অবশ্য সার্থক। আঙ্গারধানি বা আগুন রাখার পাত্রের মতন পুরো পরিবার যেন জ্বলে পুড়ে মড়ার জন্যই জন্ম নিয়েছে। তবে বইয়ের প্রচ্ছদটা দারুণ।

বইঃ আঙ্গারধানি
লেখকঃ কিঙ্কর আহসান
জনরাঃ সমকালীন উপন্যাস
প্রকাশনীঃ জাগৃতি প্রকাশনী
পৃষ্ঠাঃ ৯৫
প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪
মুল্যঃ ১৭৫ টাকা (মুদ্রিত) 

Monday, May 16, 2016

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ সত্যজিৎ রায়ের "যখন ছোট ছিলাম"।

ছোট খাটো শরীরের একটা বই। অল্প কিছু পাতা, পাতা জুড়ে কালো হরফে এক বিস্ময় মানবের স্মৃতিচারন। একজন লেখক, একজন সিনেমা পরিচালক, একজন দারুণ আর্টিস্ট, একজন মানুষ এক মলাটে নিজের ছোট বেলার স্মৃতি বর্ণনা করেছেন সাবলীল ভাবে।


বইটি দ্যা গ্রেট সত্যজিৎ রায়ের ছোটবেলার স্মৃতিচারণ। ছোট বেলা বলতে লেখক বুঝিয়েছেন মেট্রিক পরীক্ষা পর্যন্ত। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার সাথে সাথে তার মনে হয়েছে সে এখন বড় হয়ে গেছে। তাই সে পর্যন্তই নিজের ছোট ছোট স্মৃতি নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন। আর বই জুড়ে রয়েছে তার নিজের করা ইলাস্ট্রেশন। সত্যজিৎ রায়ের বই বা সিনেমার একটা মজার দিক হল বইয়ে ইলাস্ট্রেশন আর সিনেমায় ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর সবসময় তার নিজের করা।

নির্দ্বিধায় পড়তে পারেন। সুখপাঠ্য।



বইঃ যখন ছোট ছিলাম
লেখকঃ সত্যজিৎ রায়
জনরাঃ আত্মজীবনী
প্রকাশনীঃ নওরোজ
প্রকাশকালঃ জুন,১৯৮৮
পৃষ্ঠাঃ ৭৬
মুল্যঃ ৪০ টাকা (মুদ্রিত)