Saturday, January 27, 2018

বেঁচে থাকা উত্তম নয় কি?

ফাহমিদ নতুন গাড়ি কিনেছে। আগের গাড়িটা ঠিক নিজের সাথে যাচ্ছিলো না। তাই সেটা বেচে আরো অনেকগুলো টাকা পুরিয়ে নতুন গাড়িটা কিনেছে। নতুন গাড়ি কিনেই ফাহমিদ প্লান করে ফেললো লং ড্রাইভ এ যাওয়ার। বৃহস্পতিবার রাতেই রওনা দিলো লং ড্রাইভ এ। সাথে বন্ধু কিংশুক। দুজনে মিলে ঠিক করলো সিলেট যাবে। সিলেটে ঘুরে শনিবার ফিরে আসবে। রবিবার থেকে আবার সেই অফিসের ঘানি টানতে হবে।

রাত বারোটা। রাস্তার পাশের একটা ছোট্ট হোটেল থেকে খেয়ে আবার রওনা দিলো দুই বন্ধু। ঘুম যাতে না আসে সেজন্য কড়া করে দুকাপ চা খেয়ে নিয়েছে ফাহমিদ। কিংশুকের সাথে গল্প করতে করতে গাড়ি চালাচ্ছে ফাহমিদ। সাথে চলছে 50 Cent এর গান। হিপহপ তালে দুজনের মাথা দুলছে।

রাত একটা। ফাহমিদ এর সেল ফোনে একটা কল এলো। হাতে নিয়ে দেখে প্রান্তি। ফাহমিদ এর গার্লফ্রেন্ড। না রিসিভ করে উপায় নেই।

- হ্যালো।
- কতুদুর বাবু?
- অনেক দূর।
- আমাকে ফেলে এতদুর চলে গেলে? তোমার একটু ও খারাপ লাগলো না?
- তোমাকে তো আসতে বলেছিলাম। তোমার খারুস বাপের ভয়ে তো এলেনা।
- বাবা কে যদি বলতাম আমি তোমার সাথে সিলেট যাবো, আমাকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলতো।
- তো, এখন আর কি করবা, ভালো করে তেল পেয়াজ দিয়ে রান্না করে বাবার সামনে দেও।
- কি?
- নিজেকে। কাঁচা খেতে নিশ্চয়ই তোমার বাবার ভালো লাগতো না।
- তুমি কি কখনো ভালো হবে না? এইগুলান কেমন কথা?
- আর কি বলবো বল?

এভাবে চলতে থাকলো দুজনের কথা। বোর হয়ে কিংশুক ঘুমিয়ে পরেছে। ফাহমিদ কথা বলে যাচ্ছে আর এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে আছে। সামনে একটা বাক। কথা বলতে বলতে স্পীড কমাতে ভুলে গেলো ফাহমিদ। ৮০ তে রেখেই একহাতে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে বাক ঘুরতে গেলো। বাক ঘুরেই দেখে সামনে হেড লাইট। কি করবে বুঝতে পারলো না। ব্রেক এ পা দেওয়ার কথা মনেই পড়লো না।

ওপাশ থেকে প্রান্তি হ্যালো হ্যালো করতেই থাকলো। চোখ থেকে অঝোরে পানি পরছে প্রান্তির। এদিক থেকে সাড়া দেওয়ার মতো কেও নেই। কিংশুক বেচারা বুঝতেই পারলো না সে চলে যাচ্ছে। ফাহমিদ এর নতুন এলিয়ন গাড়িটা যেন টাটা ন্যানো হয়ে গেছে। ভাগ্যিস দেখার জন্য ফাহমিদ নেই। দেখলে খুব কষ্ট পেত।

বি.দ্রঃ গাড়ি চালানোর সময় সেল ফোনে কথা বলা একটা ভয়ঙ্কর কাজ। তরতাজা প্রান একটু কথা বলার কারনে রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। ধ্বংস হয়ে যায় একটা জীবন, একটা পরিবার। খুব যদি কথা বলার দরকার হয় তবে গাড়ি বা বাইক রাস্তার পাশে দাড় করিয়ে কথা বলে নিন। আর কেও যখন গাড়ি বা বাইক চালায় তখন তাকে ফোন করবেন না। যদি করেও বসেন, যদি জানতে পারেন সে গাড়ি বা বাইক চালাচ্ছে, তাহলে কথা বলবেন না। আপনার হয়তো একটু কথা বলার বাসনা আপনার প্রিয়জনের মৃত্যুর কারন হয়ে উঠতে পারে। জীবন অনেক মূল্যবান। বেঁচে থাকলে অনেক কথা বলা যাবে।



Thursday, January 25, 2018

ভালবাসি

খুব ভোরে যখন আলতো করে ঘাস ছুয়ে দেয় শিশির
তখন একমুঠো সদ্য ঝড়ে পরা শিউলি ফুল হাতে যদি বলি
ভালবাসি
হাটবে আমার হাত ধরে জীবনের পথে?

অথবা ধরো মুখে বললাম না
আসলে যদি বলতে নাই পারি
তুমি কি শিশির সিক্ত শিউলিগুলোর গন্ধ বুকে টেনে নিয়ে বুঝবে
ভালবাসি
কালকে ও কি অপেক্ষায় থাকবে আরেকমুঠো আমার জন্য?

এমনও হতে পারে মুঠো ভরা শিউলি তোমার হাতে তুলে দেয়ার সাহস হল না
শুধু নির্নিমেষ চেয়ে থাকলাম তোমার দিকে
আমার চোখের দিকে তাকিয়ে তুমি কি বুঝবে
ভালবাসি
হাত বাড়িয়ে নেবে একমুঠো ভালবাসা?


২৬.০১.১৮

Tuesday, January 16, 2018

কন্যা-জায়া-জননী।

যে কলেজ পড়ুয়া মেয়েটা প্রতিদিন গন পরিবহণে লোলুপ দৃষ্টির সামনে কুঁকড়ে থাকে সে যেদিন জানবে তার বাবা ও একি কাজ প্রত্যহ করছে তার অনুভূতি ঠিক কেমন হবে ভেবে দেখেছেন?

যে কর্মজীবী মহিলাটার প্রতিদিন অফিস যাওয়ার পথে বা অফিস থেকে ফেরার পথে সদ্য নাকের নীচে গোঁফ গজানো ছেলেদের বাজে মন্তব্যে বমি আসে, সে যেদিন জানবে তার সমবয়সী ছেলেটাও পাড়ার মোরে দাড়িয়ে একি কাজ করে তার অনুভুতিই বা কি হবে ভাবুন তো একবার।

বাটারফ্লাই ইফেক্ট এর কথা শুনেছেন কখনো? বলা হয় পৃথিবীর এক প্রান্তে যখন একটা প্রজাপতি ডানা ঝাঁপটায়, সেই ডানা ঝাপটানো বাতাসে যে নাড়া দেয়, পৃথিবীর অপর প্রান্তে যেতে যেতে সেটা প্রলয়ংকারি ঝড়ে পরিনত হয়। কেন তুললাম বাটারফ্লাই ইফেক্ট এর কথা? আপনার আমার করা ছোট ছোট অপরাধ সমাজটাকে আস্তাকুরে পরিনত করে। আমি হয়তো রাস্তায় একটা কলা খেয়ে খোসাটা ফেললাম। ভাবলাম এতে আর কি হবে। বেখেয়ালে একটা বাচ্চা ওই খোসাটায় পিছলে রাস্তায় পরে যেতে পারে। ঠিক সেসময় হয়তো আপনি আপনার নতুন কেনা বাইকটা নিয়ে বাচ্চাটার ছোট্ট মাথাটার উপর দিয়ে চলে যেতে পারেন, কারন আপনার বাইকের মিটারের কাটা তখন আশি পেড়িয়ে গেছে। আপনার আর কিছু করার ছিল না তখন।

আচ্ছা বাদ দেন। তখন স্কুলে পড়ি, রেস্লিং দেখতে খুব ভাল লাগতো। আমার প্রিয় ছিল স্টোন কোল্ড স্টিভ অস্টিন। কারো ছিল আন্ডারটেকার, কারো রক, কারো বিগ শো। সেসময় এক নারী রেসলার ছিল নাম চায়না। মনে আছে আপনার? ধরুন একটা রেস্লিং ম্যাচ আয়োজন করা হল, প্রতিযোগী চায়না ও আইনস্টাইন। কে জিতবে বলে আপনার ধারনা?

আজকালকার বাচ্চাগুলো দেখছেন কেমন যেন ব্রয়লার মুরগি হয়ে যাচ্ছে। কেন জানেন? বাবা মা চায় তার বাচ্চা ক্লাসে প্রথম হবে। ক্লাস টু এর বাচ্চার দুইটা ব্যাচ, তিনটা প্রাইভেট টিউটর। বাচ্চা পড়বে না খেলবে? সারাদিনে বাচ্চার ব্যায়াম বলতে ব্যাগ ভর্তি বই বহন। না হচ্ছে তার শারীরিক বিকাশ, না হচ্ছে মানসিক বিকাশ। যে কারনে বাচ্চাদের কথা তুললাম। একটা বাচ্চা বড় হয়ে একজন মানুষ হবে নাকি একজন জানোয়ার হবে সেটা যেসব প্রভাবকের উপর নির্ভর করে তার মধ্যে অন্যতম বাচ্চাটার শৈশব। একটা সুন্দর শৈশব পারে আপনার সন্তানকে একজন সুন্দর মনের মানুষ বানাতে। আপনার সন্তানকে মানুষ বানাচ্ছেন তো? ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানানোর সাথে সাথে মানুষ ও তো হতে হবে।

ও আচ্ছা আপনি এখনো চায়না আর আইনস্টাইন এর মারামারি করার কথা কেন বললাম বুঝতে পারেননি? বলছিলাম শক্তি দিয়ে কি সবসময় জন্মের সার্থকতা বিচার করা যায়? শতাব্দীর পর শতাব্দী নারীকে গৃহবন্দী করে তার সাথে শক্তির পরীক্ষায় জিতে যাওয়াকে আপনি হয়তো পৌরুষ ভাবতে পারেন, কিন্তু আসলেই কি সেটা পৌরুষ। কোথায় যেন পড়েছিলাম, বাচ্চা প্রসবের সময় একজন নারী যে ব্যাথা অনুভব করে সেটা প্রায় ৭০ টা (এরকমই ছিল সংখ্যাটা যতদূর মনে পড়ছে) হাড় ভাঙার সমান ব্যাথা। পারবেন সহ্য করতে? বাদ দেন।



আসুন কবি নজরুলের সুরে সুর মিলিয়ে বলি-

সাম্যের গান গাই
আমার চক্ষে পুরুষ
রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!
বিশ্বের যা কিছু মহান
সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী,
অর্ধেক তার নর।





Saturday, January 13, 2018

ভরতের দেউল- বাড়ির পাশে আরশি নগর!

ফকির লালন শাই গেয়েছিলেন, "বাড়ির পাশে পাশে আরশিনগর, (১টা লাইন গ্যাপ দিলাম) আমি একদিন ও না দেখিলাম তারে", এই চরনদ্বয় আমার সাথে অনেকটাই মিলে যেতো যদি গত শুক্রবার (১২.০১.১৮) ভরতের দেউল না যেতাম। সত্যি বলতে এমন একটা ঐতিহাসিক স্তাপত্য বাড়ির পাশেই আছে জানাই ছিল না। মাত্র কয়েকদিন আগে শুধু শুনেছিলাম যে ভরতের দেউল বলে কিছু একটা আছে।

গতকাল দাওয়াত ছিল সাতক্ষীরাতে। বন্ধুর শশুর বাড়ি। ভাল খানা দেবে, ছয় বন্ধু আর এক বড় ভাই (ভাই কম বন্ধু বেশি) মিলে রওনা হলাম বাইক নিয়ে। আমাদের রওনা হওয়ার কথা ছিল ঘড়ির কাটা সকালে যখন ৯ সংখ্যাটা স্পর্শ করবে ঠিক তখন। কিন্তু আমাদের দারুন সময়জ্ঞান, রওনা যখন দিলাম সাড়ে দশটা বেজে গেছে। খুলনা থেকে সাতক্ষীরার রাস্তা ভয়ঙ্কর খারাপ, তাই আমরা শর্ট কার্ট মারলাম সোনাডাঙ্গা বাইপাস দিয়ে, চুকনগর দিয়ে বের হবো। পথেই ভরতের দেউল বাধবে, তাই ঠিক করলাম ঢু মেরে যাবো।

কিছুদুর যেতেই বন্ধু তুষারের ভটভটি গেল বন্ধ হয়ে, স্টার্ট নেয় না। ঠেলে ঠুলে একটা গ্যারেজ এ নিয়া ঠিক করানো হল। আবার পথ চলা শুরু। হঠাৎ বন্ধু লিটন আবিস্কার করলো তার বাইক এর চাবি নাই, কখন যেন বাবার ভোগে চলে গেছে, ভাগ্যিস বাইক চালু ছিল। রাস্তায় আতিপাতি করে খুজেও পাওয়া গেল না চাবি। সবার একটাই কথা, আজ দিন আমাদের না। আবার চলা শুরু। একটু দূর যেতেই তুষারের বাইক আবার নষ্ট। একটা ভ্যান এর পেছনে রশি দিয়ে বাইক বেধে নিয়ে গেলাম শাহপুর বাজার। সেখান থেকে কোন রকম সেরে রওনা দিলাম।

চা বিরতি 


অবশেষে পৌঁছে গেলাম ভরতের দেউল বা ভরত ভয়না। কেশবপুর উপজেলার ভরত ভয়না গ্রামে এই ভরত দেউলের অবস্থান। খুলনা থেকে গেলে মিকশিমিল সড়ক ধরে ভদ্রা নদীর ব্রিজ পার হয়ে একটু সামনে গেলেই দেখতে পাবেন মেইন রোড থেকে একটা ছোট মাটির রাস্তা নেমে গেছে। সেই ছোট রাস্তার মুখেই একটা নাম ফলক, লেখা "ভরত ভয়না (আদি ঐতিহাসিক যুগের বৌদ্ধ মন্দির)। সেই রাস্তা ধরে কিছু দূর গেলেই দৃশ্যমান হবে ভরতের দেউল। প্রথম দর্শনে আমার রিয়াকশন ছিল- একি!! এ জিনিস এখানে কিভাবে এলো? এ যে সোমপুর বিহার!

ভরতের দেউল 


১২.২০ মিটার উঁচু ২৬৬ মিটার পরিধি বিশিষ্ট দেউলটিকে দূর থেকে একটি টিলার মত দেখায়। এই দেউল থেকে যেসকল প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে সেগুলো বিচার করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর ধারনা করছে এটি খ্রিস্টীয় তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শতকের মধ্যে গুপ্ত যুগে নির্মিত। ১৯২৩ সালের ১০ জানুয়ারী তদানীন্তন সরকার এটাকে পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করেন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৮৪ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দেউলের খনন কাজ চালিয়েছে। এর প্রথম অংশে আকারের স্থাপনা, দ্বিতীয় অংশে একটি মঞ্চ, তৃতীয় অংশে মূল মন্দির।

ভরতের দেউল


খননের ফলে দেউলের ভিত থেকে চূড়া পর্যন্ত ৯৪টি কক্ষ পাওয়া গেছে। স্থাপনাটির ৪ পার্শ্বে বর্ধিত আকারে ১২প টি কক্ষ। বাকী ৮২টি কক্ষ ক্রমান্বয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে। দেউলটির চূড়ায় ৪ টি কক্ষ এবং পার্শ্বে ৮ টি কক্ষ রয়েছে। স্থাপনাটির গোড়ার দিকে ৪ পার্শ্বে ৩ মিটার চওড়া রাস্তা রয়েছে। খনন করে এর মধ্যে পোড়া মাটির তৈরী নারীর মুখমন্ডল, দেবদেবীর নৃত্যের দৃশ্য সম্বলিত টেরাকোটার ভগ্নাংশ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের এ যাবত প্রাপ্ত টেরাকোটার মধ্যে এটি বৃহৎ আকৃতির। তাছাড়া নকশা করা ইট, মাটির ডাবর, পোড়া মাটির গহনার মূর্তি পাওয়া গেছে। এ অঞ্চলে অন্য কোন পুরকীর্তিতে এত বড় আকারের ইট ব্যবহৃত হয়নি।

ভরতের দেউল


ভরতের দেউলের পাশেই হরি নদী মিশিছে ভদ্রা নদীর সাথে। এককালের খরস্রোতা ভদ্রা নদী এখন একেবারে স্রোতহীন বলা চলে।

ভরতের দেউল এ আমরা

যাই হোক দেউলের চারপাশ ও উপরে উঠে ঘুরে দেখে প্রচুর সেলফি তুলে আমরা আমাদের গন্তব্য বন্ধুর শশুর বাড়ির দিকে রওনা হলাম। চুকনগর পৌঁছে তুষারের বাইক একটা গ্যারেজ এ সারতে রেখে তুষার আর লিটন সাতক্ষীরার বাসে উঠে গেল, আর আমরা বাইক নিয়ে রওনা হলাম। সে কি রাস্তা! চুকনগর এর পর থেকে আঠারো মাইল পর্যন্ত রাস্তায় যদি একবার গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার কে নিয়ে যাওয়া যেত তাহলে দেখতাম কিভাবে উনি "এই পথ যদি না শেষ হয়" গান লিখত। ভাঙা চোরা রাস্তা, ধূলার রাজ্য। পাশ দিয়ে একটা বাস বা ট্রাক যায় আর আমরা বিনে পয়সার মেকাপে লাল হয়ে যাই। উফ!

কোনমতে আঠারো মাইল পার হলাম। পাটকেলঘাটা আসতেই লিটন এর বাইক ও নষ্ট হয়ে গেল! লিটন কে ফোন করলে বলল একটু ইঞ্জিন ঠাণ্ডা করতে। কি আর করা, দাড়িয়ে থাকলাম মিনিট পাঁচেক। তারপর স্টার্ট নিল ভদ্রমহোদয়। আবার কিছুদুর গিয়ে স্টার্ট বন্ধ। আবার দাড়িয়ে অপেক্ষা। তারপর আবার যাত্রা। ভাবছি আর কি কি বাকি আছে আজ কপালে। যাই হোক পৌঁছে গেলাম সাতক্ষীরা শহরে। পানি উন্নয়ন বোর্ড এর পাশে লিটন এর শশুর বাড়ি যখন পৌছালাম তখন ঘড়ির কাটায় দুপুর তিনটা। পেটে রাজ্যের ক্ষুধা। তখন কে করে ভদ্রতা খেতে বসে পড়লাম। ইলিশ ভাজা, ইলিশের মাথা দিয়ে কচুশাক, ডিমের কোরমা, গরুর মাংস, ঘন ডাল। শেষে আবার রসগোল্লা। আর কি চাই। পেটপুজো সেরে আবার ফিরতি পথ।

এবার লিটন থেকে গেলো, ও বউ বাচ্চা নিয়ে বাসে আসবে। তুষার আর আজম বাসে চুকনগর পর্যন্ত যাবে, কারন গ্যারেজে তুষার এর বাইক রয়েছে। আমরা বাকিরা বাইকে রওনা দিলাম। লিটন এর বাইক নাফিস চালাচ্ছে। চুকনগর পর্যন্ত আসতে আরো দুবার বন্ধ হল লিটনের বাইক! চুকনগর পৌছালাম কোন মতে। গ্যারেজ থেকে তুষার এর বাইক নিলাম। খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে, শীতে কাঁপতে কাঁপতে ফিরছি। আড়ংঘাটা পার হয়ে সোনাডাঙ্গা বাইপাস দিয়ে ফিরবো। রাস্তার রেপুটেশন ভাল না, প্রায়ই ছিনতাই হয় তাই একদম একসাতে তিন বাইক চলছে, যাতে কেউ সাহস না পায়। কিন্তু কথায় বলে কপালে যদি থাকে ভোগ, চোখে যায় ধুলাবালি, পাছায় যায় জোঁক। আমাদের অবস্থা হল তাই। তুষারের ভটভটি বন্ধ আবার। চারিদিকে অন্ধকার। বেশ কিছুটা সামনে একটা কিসের যেন অফিস, আলো জ্বলছে, ঠেলে ঠুলে বাইক সেখানে নিয়ে গেলাম। আমরাও গিয়ে দাঁড়িয়েছি কারেন্ট ও চলে গেল। ব্যাস ষোল কলা পূর্ণ।

কি করা যায়? মাফলার খুলে একটার সাথে আরেকটা গেড়ো দিয়ে দড়ি বানালাম। সেই দড়ি দিয়ে তুষার এর বাইক বাধছি রিজভির বাইকের সাথে এর মধ্যে পাশ দিয়ে একটা খালি "নসিমন" গেল। ডাকলাম, দাঁড়ালো না। স্বাভাবিক, কারন ওই বেচারা ভয় পেয়েছে, অন্ধকারের মধ্যে আমরা রাস্তার পাশে যেমন করে দাড়িয়ে আছি, কেউ সাহস পাবে না আমাদের ডাকে ওখানে দাঁড়ানোর। নাফিস অবশ্য বাইক নিয়ে চলে গেল নসিমনের পেছন পেছন। কিছুক্ষন পরে দেখি, "আলেকজেন্ডার দি নাফিস" ফিরছে নসিমন নিয়ে, হাফ ছেরে বাচলাম। নসিমনের উপরে বাইক তুলে কোন মতে ফিরলাম খুলনায়।

নসিমনে তুষার এর বাইক! 
    

সেই এক দিন গেলো। আমাদের যাত্রাপথের ও ভোগান্তির সংক্ষিপ্ত ভিডিও ইউটিউবে আপলোড করেছি, দেখতে পারেন।ধন্যবাদ।





Wednesday, January 10, 2018

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ সৈয়দ মুজতবা আলীর "জলে ডাঙায়"।

"ভ্রমন কাহিনী লেখায় বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ মুজতবা আলী কে টেক্কা দেয়ার মতো কেউ এখনো জন্মেছে কিনা সন্দেহ আছে" উক্তিটি করেছিল কিছুদিন আগে এক পরিচিতজন আমি ভ্রমন কাহিনী পছন্দ করি শুনে। মুজতবা সাহেবের ছোট গল্প পড়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস পড়া হয়ে ওঠেনি কোন এক অজ্ঞাত কারনে। আর যেহেতু তার ভ্রমন কাহিনী ট্রেড মার্ক টাইপের তাই "জলে ডাঙায়" দিয়ে শুরু করলাম আমার মুজতবা আলী জার্নি।

জাহাজ আরব সাগর ধরে ছুটে চলেছে, লেখক তার দুই হাটুর বয়সী বিলেতি সঙ্গী পল ও পার্সি সাথে আমি নিজেও ভাসছি। ভ্রমন কাহিনী পড়ে যদি নিজেকে লেখকের ভ্রমন সঙ্গী নাই বানানো গেলো তবে সে কেমন ভ্রমন কাহিনী। সৈয়দ সাহেব সার্থক সেদিক থেকে নির্দ্বিধায়। সংস্কৃত, ইংরেজি, আরবি, ফার্সি, হিন্দি, গুজরাটি, ফরাসি, জার্মান ও ইতালীয় ভাষা জানা সৈয়দ সাহেবের প্রতিভা পল ও পার্সি খুব ভাল ভাবেই টের পেয়েছিল সমুদ্রের ঢেউ এ ভাসতে ভাসতে, তাইতো অসম বয়সী হলেও তাদের রসায়ন দারুন হয়ে উঠেছিল। পল ও পার্সির জন্য যেন এই ভ্রমন হয়ে উঠেছিল শিক্ষা সফর।

জাহাজেই তাদের পরিচয় আবুল আসফিয়া নূর উদ্দীন মুহম্মদ আব্দুল করিম সিদ্দীকী নামক এক রহস্য পুরুষের সাথে। এই ভদ্রলোক ছিল বলে ভ্রমনটা আরো দারুন উপভোগ্য ও উত্তেজনা পূর্ণ হয়েছে সেটা পড়লেই বুঝতে পারবেন। উপন্যাসের কাহিনী জলে ও ডাঙায় উভয় যায়গাতেই ব্যাপৃত তাই নামকরন পুরোপুরি সার্থক।

জিবুতি বন্দরের অভিজ্ঞতা ছিল ভয়ংকর। ক্যাফেতে মাছির অত্যাচারের বর্ণনা পড়ে গা গুলিয়ে উঠছিল। আর মিশর ভ্রমন ছিল টানটান উত্তেজনায় ভরা। কিসের? পড়লেই বুঝবেন। বললে তো বলাই হয়ে গেল। লেখকের বর্ণনা পড়ে আমার খুব মরুভূমিতে সূর্যাস্ত দেখার লোভ হচ্ছে। তবে শেষে এসে পল ও পার্সির জন্য খুব মন খারাপ হচ্ছে।

সৈয়দ সাহেবের আরেকটা ট্রেডমার্ক বিষয় হল হিউমার। দারুন দারুন সব হিউমারে পূর্ণ উপন্যাসটি। এ বইটি মূলত কিশোরদের জন্য লেখা হলেও সব বয়সীরা সমান ভাবে উপভোগ করবে বলেই আমার মনে হয়।

Monday, January 8, 2018

ঐতিহাসিক স্থাপত্যের নগরী বাগেরহাটে একবেলা।

গত শুক্রবার (০৫.০১.২০১৮) হুঠ করেই বাইক নিয়ে বন্ধুরা মিলে চলে গিয়েছিলাম ঐতিহাসিক স্থাপত্যের নগরী বাগেরহাট। ঐতিহাসিক ভাবে বাগেরহাট দারুন সমৃদ্ধ এক নগরী ছিল। উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে-  খ্রীষ্টের জন্মের প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে মধ্য এশিয়া হতে এ অঞ্চলে আর্য তথা আদি নর্কিভ বা ইন্ডিভদের আগমণ ঘটে। এছারা পরবর্তীতে মুসলিম আমলেও এই নগরী ছিল বিখ্যাত। খান-উল-আযম উলুঘ খান-ই-জাহান যাকে আমরা হযরত খান জাহান (রহ:) হিসেবে চিনি, তার স্মৃতিবিজড়িত শহর এই বাগেরহাট। তাই বাগেরহাট জেলার আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মধ্যযুগীয় মুসলিম স্থাপত্য। বাগেরহাট শহর কে ঐতিহাসিক মসজিদের শহর ও বলা হয়।

বাগেরহাটের ঐতিহাসিক মসজিদের মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় হল ষাট গম্বুজ মসজিদ। বেশ কয়েকবার যাওয়ার কারনে আমরা এবার আর ষাট গম্বুজ মসজিদে যাইনি।

প্রথমে যাই জিন্দা পীরের মাজার। এটা একদম খানজাহান আলীর মাজারের পাশেই। স্থানীয়রা মনে করেন একজন বুজুর্গ ব্যাক্তি এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন যিনি কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করা অবস্থায় একদিন অদৃশ্য হয়ে যান। একারণে মনে করা হয়ে থাকে যে ঐ ব্যাক্তি এখনও জীবিত আছেন আর তাই তাঁকে জিন্দা পীর বলা হয় এবং মসজিদটিকে বলা হয় জিন্দা পীরের মসজিদ।

জিন্দা পীরের মসজিদ


জিন্দা পীরের মসজিদ

এরপরে চলে যাই পাশেই খানজাহান আলীর দরগা শরীফে। সেখানে মাইকিং করে যেভাবে মানতের টাকা কালেকশন করা হচ্ছে মনে হচ্ছিল জিবাংলায় অ্যাড হচ্ছে, আদী মোহিনীমোহন কাঞ্জিলাল, আমাদের আর কোন শাখা নেই।


হযরত খান জাহান (রহঃ) এর মাজার শরীফ

হযরত খান জাহান (রহঃ) এর দরগা শরীফের দীঘি 


যাই হোক, এবার কোথায় যাবো? যেহেতু কোন প্লান নেই, তাই মাথা চুলকাতে চুলকাতে মনে পড়লো কোদলা মঠের কথা। আমি আগে গেলেও বাকিরা কেও যায় নি। তাই ভু ভু (যেহেতু বাইক নিয়ে গিয়েছিলাম) করতে করতে চলে গেলাম সবাইকে কোদলা মঠ বা অযোধ্যা মঠ দেখাতে। আমার দারুন প্রিয় একটা যায়গা। এটা পড়েছে যাত্রাপুর উপজেলার বারুইপাড়া ইউনিয়নের অযোধ্যা গ্রামে। যাত্রাপুর বাজার থেকে ৩ কি.মি মতো ভেতরে। ১৮.২৯ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট এই মঠটির দেয়ালের প্রশস্ততা ২.৭৫ মিটার। মঠটির উত্তর দিক ব্যাতিত পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিন দিকে একটি করে প্রবেশ পথ রয়েছে, তবে মূল প্রবেশ পথটি দক্ষিন দিকে। এ মঠটি প্রকৃত পক্ষে একটি স্মৃতি সৌধ। মঠে প্রাপ্ত একটি ভগ্নপ্রায় বাংলালিপি থেকে জানা যায়, জনৈক ব্রাহ্মণ তারক ব্রহ্মের অনুগ্রহ লাভের জন্য এই মঠটি নির্মাণ করেন। সম্ভবত এটি সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে নির্মিত। আবার জনশ্রুতি আছে যে, যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য তার সভাসদ গৃহের পণ্ডিত অবিলম্বা সরস্বতীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই মঠটি নির্মাণ করেন। 

কোদলা মঠ/ অযোধ্যা মঠ 

কোদলা মঠের প্রবেশ পথ। 


সেই ট্যুরের কিছু মুহূর্তকে মুঠোফোন বন্দী করেছিলাম। যদি ইচ্ছে করে তবে দেখতে পারেন।


Wednesday, January 3, 2018

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ শাহযাদ ফিরদাউস এর "কানানগণ"।

মর্ত্যলোকের প্রথম পুরুষ আড্যাম বা আদম এবং প্রথম নারী ইভ বা হাওয়া। স্বর্গের নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার শাস্তিস্বরূপ তাদের মর্ত্যলোকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। এখনে জন্ম নেওয়া তাদের ১৪০ জোড়া সন্তান সন্ততির মধ্যে মুসলিম মতে হাবীল ও কাবিল এবং খ্রিস্টীয় মতে আবেল ও কেইন বা কেইনান অন্যতম। কেন অন্যতম? কারন পৃথিবীতে প্রথম সংগঠিত মনুষ্য হত্যাকান্ড ঘটে এদের মাধ্যমেই। সেমটিক ধর্মমতে জানা যায় আবেল এর প্রতি ঈশ্বর এর পক্ষপাতিত্বের কারনে ক্রুদ্ধ কেইন বিদ্বেসবসে হত্যা করেছিল কনিষ্ঠকে।

শাহযাদ ফিরদাউস তার "কানানগণ" উপন্যাস লিখেছেন এই কাহিনীর অস্থিতেই মেদ-মজ্জা-রক্ত- মাংস সংযোজন করে। কাহিনী শুরু হয় কোন এক বসন্ত কালে। মধ্যরাতে উঠোনের দুপাশে দুই দাওয়ায় ঘুমিয়ে ছিল দুই ভাই কেইন ও আবেল। সেরাতে দুভাই একি স্বপ্ন দেখল। স্বপ্নটা এমন ছিল যে বাবা আদম একটা বড় সিন্দুক টেনে নিয়ে একজায়গা মাটিতে পুতে রাখলো। কি আছে সেই সিন্দুকে। কে নেবে সিন্দুকের গুপ্তধন।

আবেল প্রথম পৌছায় সিন্দুকেরে কাছে। মাটি খুড়ে বের করে সিন্দুক, ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে দেখছিল কেইন। সিন্দুক তোলা হতেই কেইন নিজের শাবল নিয়ে ঝাপিয়ে পরে আবেল এর উপর, তাকে হত্যা করে সিন্দুকের মালিকানা নিজের দখলে নিয়ে নেয়।


এখানে এসে লেখক ক্রিস্টোফার নোলান এর "ইনসেপশন" মুভির মত আবহ সৃষ্টি করেছেন। শুরু হয় স্বপ্ন আর বাস্তবের দন্ধ। কেইন ও আবেল ঘুরতে থাকে স্বপ্নের ল্যাবিরিন্থ বা গোলকধাঁধায়। কেইন বার বার খুণ করতে থাকে আবেল কে। আবেল বার বার জেগে উঠতে থাকে।


এক পর্যায়ে আবেল বলছে কেইন কে-

- তারপর রক্তাক্ত অতীতের মতো রক্তে রঞ্জিত হবে তোমার বর্তমান।
- তারপর ও তোকে খুন করবো।
- তারপর রক্তাক্ত বর্তমানের মতোই রক্তে রক্তে রক্তাক্ত হবে তোমার ভবিষ্যৎ।
- হয়তো তারপর ও তোকে খুন করব!
- তুমি হবে পলাতক,যাযাবর, অভিশপ্ত!
- হয়তো তারপর ও তোকে খুন করব!


এভাবেই যুগের পর যুগ ধরে আমরা ভ্রাত্রিঘাতি। আমরা এভাবেই রক্তাক্ত করেছি আমাদের অতীত, করছি বর্তমান, করবো ভবিষ্যৎ ও। লেখক বলেছেন- "যতকাল মানুষের হাতের কাছে বন্ধ সিন্দুকের অস্তিত্ব থাকবে ততকাল তার হাতে নির্মম ভাবে নিহত হবে তার ভবিষ্যৎ"।

অসাধারন একটি উপন্যাস "কানানগণ"। দারুন রচনাশৈলী আটকে রাখবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। শাহযাদ ফিরদাউস এখন পর্যন্ত আমাকে হতাশ তো করেননি, বরং প্রতিটা উপন্যাসে চমকে দিয়েছেন। ২০১৮ সালটা শুরু করলাম দারুন এক উপন্যাস দিয়ে।



বইঃ কানানগণ
লেখকঃ শাহযাদ ফিরদাউস
প্রকাশনিঃ কবি
প্রকাশকালঃ অগাস্ট, ২০১৭
পৃষ্ঠাঃ ৮০
মুল্যঃ ১৭৫/- (মুদ্রিত)