Saturday, January 13, 2018

ভরতের দেউল- বাড়ির পাশে আরশি নগর!

ফকির লালন শাই গেয়েছিলেন, "বাড়ির পাশে পাশে আরশিনগর, (১টা লাইন গ্যাপ দিলাম) আমি একদিন ও না দেখিলাম তারে", এই চরনদ্বয় আমার সাথে অনেকটাই মিলে যেতো যদি গত শুক্রবার (১২.০১.১৮) ভরতের দেউল না যেতাম। সত্যি বলতে এমন একটা ঐতিহাসিক স্তাপত্য বাড়ির পাশেই আছে জানাই ছিল না। মাত্র কয়েকদিন আগে শুধু শুনেছিলাম যে ভরতের দেউল বলে কিছু একটা আছে।

গতকাল দাওয়াত ছিল সাতক্ষীরাতে। বন্ধুর শশুর বাড়ি। ভাল খানা দেবে, ছয় বন্ধু আর এক বড় ভাই (ভাই কম বন্ধু বেশি) মিলে রওনা হলাম বাইক নিয়ে। আমাদের রওনা হওয়ার কথা ছিল ঘড়ির কাটা সকালে যখন ৯ সংখ্যাটা স্পর্শ করবে ঠিক তখন। কিন্তু আমাদের দারুন সময়জ্ঞান, রওনা যখন দিলাম সাড়ে দশটা বেজে গেছে। খুলনা থেকে সাতক্ষীরার রাস্তা ভয়ঙ্কর খারাপ, তাই আমরা শর্ট কার্ট মারলাম সোনাডাঙ্গা বাইপাস দিয়ে, চুকনগর দিয়ে বের হবো। পথেই ভরতের দেউল বাধবে, তাই ঠিক করলাম ঢু মেরে যাবো।

কিছুদুর যেতেই বন্ধু তুষারের ভটভটি গেল বন্ধ হয়ে, স্টার্ট নেয় না। ঠেলে ঠুলে একটা গ্যারেজ এ নিয়া ঠিক করানো হল। আবার পথ চলা শুরু। হঠাৎ বন্ধু লিটন আবিস্কার করলো তার বাইক এর চাবি নাই, কখন যেন বাবার ভোগে চলে গেছে, ভাগ্যিস বাইক চালু ছিল। রাস্তায় আতিপাতি করে খুজেও পাওয়া গেল না চাবি। সবার একটাই কথা, আজ দিন আমাদের না। আবার চলা শুরু। একটু দূর যেতেই তুষারের বাইক আবার নষ্ট। একটা ভ্যান এর পেছনে রশি দিয়ে বাইক বেধে নিয়ে গেলাম শাহপুর বাজার। সেখান থেকে কোন রকম সেরে রওনা দিলাম।

চা বিরতি 


অবশেষে পৌঁছে গেলাম ভরতের দেউল বা ভরত ভয়না। কেশবপুর উপজেলার ভরত ভয়না গ্রামে এই ভরত দেউলের অবস্থান। খুলনা থেকে গেলে মিকশিমিল সড়ক ধরে ভদ্রা নদীর ব্রিজ পার হয়ে একটু সামনে গেলেই দেখতে পাবেন মেইন রোড থেকে একটা ছোট মাটির রাস্তা নেমে গেছে। সেই ছোট রাস্তার মুখেই একটা নাম ফলক, লেখা "ভরত ভয়না (আদি ঐতিহাসিক যুগের বৌদ্ধ মন্দির)। সেই রাস্তা ধরে কিছু দূর গেলেই দৃশ্যমান হবে ভরতের দেউল। প্রথম দর্শনে আমার রিয়াকশন ছিল- একি!! এ জিনিস এখানে কিভাবে এলো? এ যে সোমপুর বিহার!

ভরতের দেউল 


১২.২০ মিটার উঁচু ২৬৬ মিটার পরিধি বিশিষ্ট দেউলটিকে দূর থেকে একটি টিলার মত দেখায়। এই দেউল থেকে যেসকল প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে সেগুলো বিচার করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর ধারনা করছে এটি খ্রিস্টীয় তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শতকের মধ্যে গুপ্ত যুগে নির্মিত। ১৯২৩ সালের ১০ জানুয়ারী তদানীন্তন সরকার এটাকে পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করেন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৮৪ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দেউলের খনন কাজ চালিয়েছে। এর প্রথম অংশে আকারের স্থাপনা, দ্বিতীয় অংশে একটি মঞ্চ, তৃতীয় অংশে মূল মন্দির।

ভরতের দেউল


খননের ফলে দেউলের ভিত থেকে চূড়া পর্যন্ত ৯৪টি কক্ষ পাওয়া গেছে। স্থাপনাটির ৪ পার্শ্বে বর্ধিত আকারে ১২প টি কক্ষ। বাকী ৮২টি কক্ষ ক্রমান্বয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে। দেউলটির চূড়ায় ৪ টি কক্ষ এবং পার্শ্বে ৮ টি কক্ষ রয়েছে। স্থাপনাটির গোড়ার দিকে ৪ পার্শ্বে ৩ মিটার চওড়া রাস্তা রয়েছে। খনন করে এর মধ্যে পোড়া মাটির তৈরী নারীর মুখমন্ডল, দেবদেবীর নৃত্যের দৃশ্য সম্বলিত টেরাকোটার ভগ্নাংশ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের এ যাবত প্রাপ্ত টেরাকোটার মধ্যে এটি বৃহৎ আকৃতির। তাছাড়া নকশা করা ইট, মাটির ডাবর, পোড়া মাটির গহনার মূর্তি পাওয়া গেছে। এ অঞ্চলে অন্য কোন পুরকীর্তিতে এত বড় আকারের ইট ব্যবহৃত হয়নি।

ভরতের দেউল


ভরতের দেউলের পাশেই হরি নদী মিশিছে ভদ্রা নদীর সাথে। এককালের খরস্রোতা ভদ্রা নদী এখন একেবারে স্রোতহীন বলা চলে।

ভরতের দেউল এ আমরা

যাই হোক দেউলের চারপাশ ও উপরে উঠে ঘুরে দেখে প্রচুর সেলফি তুলে আমরা আমাদের গন্তব্য বন্ধুর শশুর বাড়ির দিকে রওনা হলাম। চুকনগর পৌঁছে তুষারের বাইক একটা গ্যারেজ এ সারতে রেখে তুষার আর লিটন সাতক্ষীরার বাসে উঠে গেল, আর আমরা বাইক নিয়ে রওনা হলাম। সে কি রাস্তা! চুকনগর এর পর থেকে আঠারো মাইল পর্যন্ত রাস্তায় যদি একবার গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার কে নিয়ে যাওয়া যেত তাহলে দেখতাম কিভাবে উনি "এই পথ যদি না শেষ হয়" গান লিখত। ভাঙা চোরা রাস্তা, ধূলার রাজ্য। পাশ দিয়ে একটা বাস বা ট্রাক যায় আর আমরা বিনে পয়সার মেকাপে লাল হয়ে যাই। উফ!

কোনমতে আঠারো মাইল পার হলাম। পাটকেলঘাটা আসতেই লিটন এর বাইক ও নষ্ট হয়ে গেল! লিটন কে ফোন করলে বলল একটু ইঞ্জিন ঠাণ্ডা করতে। কি আর করা, দাড়িয়ে থাকলাম মিনিট পাঁচেক। তারপর স্টার্ট নিল ভদ্রমহোদয়। আবার কিছুদুর গিয়ে স্টার্ট বন্ধ। আবার দাড়িয়ে অপেক্ষা। তারপর আবার যাত্রা। ভাবছি আর কি কি বাকি আছে আজ কপালে। যাই হোক পৌঁছে গেলাম সাতক্ষীরা শহরে। পানি উন্নয়ন বোর্ড এর পাশে লিটন এর শশুর বাড়ি যখন পৌছালাম তখন ঘড়ির কাটায় দুপুর তিনটা। পেটে রাজ্যের ক্ষুধা। তখন কে করে ভদ্রতা খেতে বসে পড়লাম। ইলিশ ভাজা, ইলিশের মাথা দিয়ে কচুশাক, ডিমের কোরমা, গরুর মাংস, ঘন ডাল। শেষে আবার রসগোল্লা। আর কি চাই। পেটপুজো সেরে আবার ফিরতি পথ।

এবার লিটন থেকে গেলো, ও বউ বাচ্চা নিয়ে বাসে আসবে। তুষার আর আজম বাসে চুকনগর পর্যন্ত যাবে, কারন গ্যারেজে তুষার এর বাইক রয়েছে। আমরা বাকিরা বাইকে রওনা দিলাম। লিটন এর বাইক নাফিস চালাচ্ছে। চুকনগর পর্যন্ত আসতে আরো দুবার বন্ধ হল লিটনের বাইক! চুকনগর পৌছালাম কোন মতে। গ্যারেজ থেকে তুষার এর বাইক নিলাম। খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে, শীতে কাঁপতে কাঁপতে ফিরছি। আড়ংঘাটা পার হয়ে সোনাডাঙ্গা বাইপাস দিয়ে ফিরবো। রাস্তার রেপুটেশন ভাল না, প্রায়ই ছিনতাই হয় তাই একদম একসাতে তিন বাইক চলছে, যাতে কেউ সাহস না পায়। কিন্তু কথায় বলে কপালে যদি থাকে ভোগ, চোখে যায় ধুলাবালি, পাছায় যায় জোঁক। আমাদের অবস্থা হল তাই। তুষারের ভটভটি বন্ধ আবার। চারিদিকে অন্ধকার। বেশ কিছুটা সামনে একটা কিসের যেন অফিস, আলো জ্বলছে, ঠেলে ঠুলে বাইক সেখানে নিয়ে গেলাম। আমরাও গিয়ে দাঁড়িয়েছি কারেন্ট ও চলে গেল। ব্যাস ষোল কলা পূর্ণ।

কি করা যায়? মাফলার খুলে একটার সাথে আরেকটা গেড়ো দিয়ে দড়ি বানালাম। সেই দড়ি দিয়ে তুষার এর বাইক বাধছি রিজভির বাইকের সাথে এর মধ্যে পাশ দিয়ে একটা খালি "নসিমন" গেল। ডাকলাম, দাঁড়ালো না। স্বাভাবিক, কারন ওই বেচারা ভয় পেয়েছে, অন্ধকারের মধ্যে আমরা রাস্তার পাশে যেমন করে দাড়িয়ে আছি, কেউ সাহস পাবে না আমাদের ডাকে ওখানে দাঁড়ানোর। নাফিস অবশ্য বাইক নিয়ে চলে গেল নসিমনের পেছন পেছন। কিছুক্ষন পরে দেখি, "আলেকজেন্ডার দি নাফিস" ফিরছে নসিমন নিয়ে, হাফ ছেরে বাচলাম। নসিমনের উপরে বাইক তুলে কোন মতে ফিরলাম খুলনায়।

নসিমনে তুষার এর বাইক! 
    

সেই এক দিন গেলো। আমাদের যাত্রাপথের ও ভোগান্তির সংক্ষিপ্ত ভিডিও ইউটিউবে আপলোড করেছি, দেখতে পারেন।ধন্যবাদ।





No comments:

Post a Comment